দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে রোববার (১৯ জানুয়ারি) শেষ হলো তাবলিগ জামাত আয়োজিত ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমা। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এ আখেরি মোনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্য দুই হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়।

 

এ সময় ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মধ্যাহ্নের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় লাখ লাখ মুসল্লি আকুতি জানান। মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষ স্থানীয় মুরব্বি ভারতের মাওলানা জমশেদ।

 

ভোর থেকে দিক-নির্দেশনামূলক বয়ানের পর লাখ লাখ মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটে। জনসমুদ্রে হঠাৎ নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাত তোলেন মহান আল্লাহর দরবারে। কান্নায় বুক ভাসান তারা। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াত ও উর্দু ভাষায় ১৭ মিনিট ব্যাপী এ মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা জমশেদ।

 

মুঠোফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের আরও লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন মহান আল্লাহর দরবারে। আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণীবিতান, অফিসসহ সবকিছু ছিল বন্ধ।

 

রোববার সকালে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি হেঁটেই টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা স্থলে পৌঁছান। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলি-গলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন।

 

ভোর থেকেই ফজরের নামাজ ও আখেরি মোনাজাতের জন্য পুরোনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস- দোকানের ছাদ, যানবাহনের ছাদ ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। যে দিকেই চোখ যায় সে দিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পরা মানুষ। আখেরি মোনাজাতের জন্য রোববার আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছুটি ছিল। নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মোনাজাতে অংশ নিতে রোববার সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছান।

 

মোনাজাতে যা বলা হয় : মাওলানা জমশেদ মোনাজাতে বলেন, হে আল্লাহ তুমি তো ক্ষমাশীল, তোমার কাছেই তো আমরা ক্ষমা চাইব। দ্বীনের ওপর আমাদের চলা সহজ করে দাও। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আমরা যেন তোমার সন্তুষ্টি মাফিক চলতে পারি সে তওফিক দাও। দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে আমাদের হেফাজত করো। নবীওয়ালা জিন্দেগি আমাদের নসিব করো। ইজতেমাকে কবুল ও মঞ্জুর করো। আমাদের ঈমানকে মজবুত করে দাও। দ্বীনের পথে মেহনত করার তওফিক দান করো।

 

 

মুসল্লিদের ঢল : বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীরা ছাড়াও শুধু আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ছুটে আসতে থাকেন শনিবার থেকেই। বাস, ট্রাক, মিনিবাস, কার, মাইক্রোবাস, ট্রেন, লঞ্চ ও স্টিমারে করে টঙ্গীতে পৌঁছে অবস্থান নিতে শুরু করেন। রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন ভিড় এড়াতে শীত, কুয়াশা ও নানা ঝক্কি ঝামেলা উপেক্ষা করে রাতেই টঙ্গীমুখো হন।

 

বিদেশীদের অংশগ্রহণ : বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে ৫৫টি দেশের প্রায় আড়াই হাজার হাজার মুসল্লি যোগ দেন। এর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরাক, ইরান, লিবিয়া, জর্ডান, আরব আমিরাত, ইথুয়িপিয়া, আফ্রিকা, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ থেকে মুসল্লিরা অংশ নেন।

 

 

মোনাজাত শেষে জনজট ও যানজট : আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে আশা মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করেন। আগে যাওয়ার জন্য মুসল্লিরা তাড়াহুড়া করতে শুরু করেন। এতে টঙ্গীর কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী- কালীগঞ্জ সড়কের আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক এবং সংযোগ সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট।

 

 

গাজীপুর ও টঙ্গীর সকল কারখানায় ছুটি : বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে গাজীপুর ও টঙ্গীর সকল কারখানায় ছুটি ছিল। ফলে এবার এসব কারখানার শ্রমিকদের ইজতেমায় আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে সমস্যা হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here