সামনে পহেলা বৈশাখ। তাই দেশের ইলিশ অধ্যুষিত নদীতে ইলিশ মাছ ধরা জেলেদের কদর বেড়েছে অনেকটাই। এই কদর অব্যাহত থাকবে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত। কারণ, টাটকা ইলিশ পেতে হলে এই জেলেদের কাছেই যেতে হবে। পহেলা বৈশাখের দিনে পান্তার সঙ্গে পাতে ইলিশ তোলার যে চল ছড়িয়ে পড়েছে, সে কারণেই এই তৎপরতা। যদিও পহেলা বৈশাখে ইলিশ পরিহারে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ রয়েছে। এরপরেও ইলিশের প্রতি আগ্রহ কমছে না ক্রেতা-বিক্রেতা কারোরই। আর এই সুযোগটি লুফে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের কয়েকটি এলাকায় ইলিশ মাছ ধরা জেলেদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জাটকা ধরাও চলবে এই সুযোগে।

জানা গেছে, প্রধানন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই ইলিশ পরিহার করছেন। তবে বৈশাখকে সামনে রেখে বাজারে ইলিশের খোঁজ করার ক্রেতার সংখ্যাই বেশি। চাহিদা বাড়ার এই সুযোগ বুঝে দামও বাড়বে ইলিশের। ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটি নিতে এখন থেকেই ইলিশের মজুত গড়ছেন। পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আড়তদার পর্যন্ত সবাই এখন এই কাজে ব্যস্ত বলে জানা গেছে। পহেলা বৈশাখ ঘনিয়ে আসার সপ্তাহখানেক আগে থেকেই এসব মাছ বাজারে ছাড়া হবে।

দেশের ইলিশ অধ্যুষিত ভোলা জেলার তেতুলিয়া, পিরোজপুর জেলার সন্ধ্যা ও বলেশ্বর, বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার পায়রা নদীতে ইলিশ মাছ ধরা কয়েকজন জেলে সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আড়তদাররা নদীতে গিয়ে সরাসরি জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনছেন। একইভাবে সরাসরি বিক্রির উদ্দেশ্যে রাজধানীর বড় বড় সুপার শপের কর্ণধাররাও একইভাবে নদীতে জেলেদের কাছ থেকে টাটকা ইলিশ কিনছেন। কেউ কেউ বায়না করে রাখছেন। জেলেরা জানিয়েছেন, নদীতে এখন তাদের বড়ই কদর।

জানতে চাইলে পিরোজপুরের পাড়েরহাটের আড়তদার সেকেন্দার আলী জানান, ‘সামনে পহেলা বৈশাখ। তাই বাজারে এখন সব ধরনের ইলিশের কদর বেশি। এটাই স্বাভাবিক। পহেলা বৈশাখ যতই ঘনিয়ে আসবে দামও বাড়বে ততই। তবে বড় সাইজের ইলিশ মাছের চাহিদা সব সময়ই বেশি।’

ভোলার তেতুলিয়া নদীতে ইলিশ মাছ ধরা জেলে সোবাহান আকন্দ বলেন, ‘রাজধানীর ব্যবসায়ীরা নদীতে এসে আমাদের নৌকা থেকে সরাসরি মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কাছে আমরা সরাসরি বিক্রি করতে না চাইলেও তারা অনেকটা জোর করে বেশি দামের প্রলোভনে আমাদের বিক্রি করতে বাধ্য করছেন।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘আমরা চাইলেও স্থানীয় আড়তদার ছাড়া অন্য কারও কাছে মাছ বিক্রি করতে পারি না। কেননা, স্থানীয় আড়তদারদের কাছ থেকে আমরা দাদন নিয়েছি। দাদনের টাকা পরিশোধ করতেই আমাদের জালে ধরা মাছ তাদের কাছেই বিক্রি করতে বাধ্য। তারপরেও রাজধানীর ক্রেতাদের কাছে লুকিয়ে পালিয়ে বিক্রি করছেন কেউ কেউ।’

রাজধানীর কাওরানবাজার, শ্যামবাজার, যাত্রাবাড়ী বাজারসহ দেশের সর্বত্রই এখন ইলিশের ব্যাপক চাহিদা। রাজধানীর খিলগাঁও কাঁচাবাজার, শান্তিনগর বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে ৪শ’ থেকে ৫শ’ গ্রাম ওজনের প্রতি জোড়া ইলিশ কিনতে এখন ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে এক হাজার থেকে ১২শ’ টাকা। কয়েকটি সুপার শপ ঘুরে দেখা গেছে, এক থেকে দেড় হাজার টাকার কমে এখন কোনও ইলিশ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এসব মাছ সর্বোচ্চ ৬শ’ থেকে সাড়ে ৭শ’ গ্রাম ওজনের।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ে মগবাজার থেকে ইলিশ মাছ কিনতে আসা একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরিরত হোসেন জাহিদ বলেন, ‘১০/১১ বছর ধরে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ইলিশ মাছ কিনি সন্তানদের জন্য। বছরের একটি দিন বলে টাকার দিকটাকে বড় করে দেখি না। এবারও বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশ মাছ কিনতে এসেছি। মাছের দাম এখনও নাগালের মধ্যে। তবে পহেলা বৈশাখ ঘনিয়ে এলে দাম বাড়বে। তাই আগেভাগে কিনে রাখছি।’ প্রধানমন্ত্রীর ইলিশ পরিহারের আহ্বান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা ছোট। তারা তো আহ্বান বোঝে না। তাদের আবদার ইলিশের। বাপ হিসেবে কীভাবে এড়িয়ে যাই বলুন?’

এ বিষয়ে জানতে পিরোজপুরের পাড়েরহাট বন্দরের মাছ ব্যবসায়ী (আড়তদার) ইসমাইল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘বর্তমানে জাটকা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নদীতে জাল ফেলা নিষিদ্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় আমরা আড়তদাররা ঢাকায় কোনও মাছ সরবরাহ করি না। আমাদের আড়ত খালি। কোনও মাছ নাই। নদীতে চুপেচাপে ২/১ জন জেলে হয়তো জাল ফেলে। তাতে যে জাটকা বাদ দিয়ে ইলিশ মাছ ধরা পড়ে তা স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হয়। অনেকে জেলেদের নৌকা থেকেও সরাসরি ইলিশ কিনে নিয়ে যায়। তবে কোনও কোনও আড়তে হয়তো আগের কেনা মাছ থাকতে পারে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে একটু বেশি মুনাফার আশায় আগের কেনা মাছগুলো ফ্রিজিং করে রাখতে পারে। সেগুলোই হয়তো সামনের কয়েকদিনের মধ্যে রাজধানীর বাজারগুলোয় বিক্রি হবে।’

একই তথ্য জানিয়েছেন বরিশাল চাঁন্দ রোডের মাছ ব্যবসায়ী এবাদত হোসেন। তিনি বলেন, ‘এই সিজনে আড়তে মাছ পাবো কোথায়? বর্তমানে আড়তের শ্রমিকেরা তাস ও লুডু খেলে সময় কাটায়।’ এই যদি মোকামের অবস্থা হয় তাহলে ঢাকার বাজারে বড় ইলিশ আসে কোথা থেকে- জানতে চাইলে এবাদত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে অনেকেই বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশ মাছ মজুত করে রাখবে।’

জানা গেছে, প্রতিবছরই পহেলা বৈশাখের আগে কিছু ব্যবসায়ী ইলিশ মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এতে দাম আরও বেড়ে যায়। গত বছরও বেশ কিছু ব্যবসায়ী রফতানির জন্য মাছ মজুত করেন। বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে গত বছর ১১টি রফতানিকারী প্রতিষ্ঠানকে মজুত রাখা ১ হাজার ১৫ মেট্রিক টন ইলিশ বাজারে ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল। বর্তমানে ইলিশ রফতানি বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারিভাবে ইলিশ রফতানি বন্ধ হলেও পাচার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভারতে প্রতিনিয়তই পাচার হচ্ছে ইলিশ।

মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্র জানায়, ২০১২ সালের জুলাই থেকে ইলিশ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিষেধাজ্ঞার আগে বাংলাদেশ থেকে ভারত, ইতালি ও আমেরিকায় ইলিশ রফতানি হতো। ২০১১-১২ অর্থবছর থেকেই হিমায়িত ইলিশ ৪ হাজার ৭৫ টন, তাজা ইলিশ ৪ হাজার ৪৯৪ টন রফতানি হয়। সেই সময়কার দর হিসেবে যার আনুমানিক মূল্য ছিল ২৯৭ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে শুধু তাজা ইলিশ রফতানি হয়েছে ৩৮৮ টন। যার মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here