জলবায়ু পরিবতনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করে বাংলাদেশের উপকুলীয় অঞ্চলের জলাবন্ধ এলাকাগুলোতে পানির উপরে সাফল্যের সাথে সবজি চাষ করে কৃষি ক্ষেত্রে বিল্পব সৃষ্টি করেছে কৃষকরা। এই অঞ্চলের জলাবন্ধ এলাকাগুলোতে পানির উপর চাষাবাদ পদ্ধতি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে কৃষকরা যেমন লাভবান হচ্ছেন ঠিক একইভাবে জলবায়ু পরিবরতনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবেলা করার একটি কাযকর বিকল্প উদ্যোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর পানির উপর ভাসমান বাগানে সবজি চাষ করে অনন্য নজির সৃস্টি করায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) দেশের নাজিরপুর এলাকাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের উপকুলীয় অঞ্চলের অন্যতম ক্ষতিগ্রহস্থ জেলা হচ্ছে পিরোজপুর। বঙ্গপোসাগরের পানির লেবেল বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের উপকুলীয় অঞ্চলের অনেক নিম্ন এলাকার মত পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী দোবড়া এবং কলার দোয়ানিয়া ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলগুলো জলাববন্ধ হয়ে পড়েছে। এই দুটি ইউনিয়নের বিপুল পরিমান জমি সারা বছরই জলাবন্ধতা থাকে। ফলে দীঘদিন এই এলাকায় চাষাবাদ করা সম্ভব না হওয়ায় বিপূল সংখ্যক কৃষক মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে আসছিল।

কিন্তু এই এলাকার কৃষকগন জলাবন্ধ এই নিম্নাঞ্চলের পানির উপর ভাসমান পদ্ধতিতে গাছের চারা ও সবজি উৎপাদন করে কৃষিক্ষেত্রে বিল্পব ঘটিয়েছে। দুই ‍যুগ আগেও এই এলাকায় গেলে দেখা যেত মাইলের পর মাইল এলাকায় শুধু পানি আর পানি। আর এখন এই এলাকায় গেলে দেখা যাবে পানির উপর ভাসছে বিভিন্ন ধরণের সবজির বাগান। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈরী পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে এই এলাকার কৃষকরা নিজেদের কৌশলে পানির উপর গড়ে তুলেছেন ভাসমান সবজির বাগান ও বিজতলা।

নাজিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিক বিজয় হাজরা এ বিষয়ে বলেন, এখানে ২০০ হেক্টর জমিতে এই ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা চাষ করা হয়। এখানে চাষীরা বেশির ভাগ জমির বেডে সবজি জাতীয় ও লতাজ জাতীয় ফসল উৎপাদন করে এবং কিছু কিছু চাষ উৎপাদন করে এবং মসলার মধ্যে হলুদ উৎপাদন করে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এইটা এভয়েড করার জন্য মূলত চাষীরা এই ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা চাষাবাদ করে থাকে।

দেউলবাড়ী দোবড়া ইউনিয়নের বিল ডুমোরিয়া গ্রামের প্রবীন কৃষক আব্দুস সাত্তার ব্যাপারী বলেন, দুই যুগ আগেও তার জমি বছরের অর্ধেক সময় পানিবন্দি থাকতো। তখন শুকনো মওসুমে পানি নেমে গেলে জমিতে তিনি ধান চাষ করতেন। কিন্তু বছর বিশেক আগে তার জমি পুরোপুরি পানির নীচে তলিয়ে যায়। বছরের পুরোটা সময়ই জমি পানির নীচে তলিয়ে থাকায় চাষাবাদ করা যেত না। ফলে তার মত অনেক কৃষকের মাথায় হাত পড়ে। তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকেন।

এ বিষয়ে বিল ডুমোরিয়া গ্রামের প্রবীণ কৃষক আব্দুস সাত্তার ব্যাপারী বলেন, আগে তো ভালুই ফসল হয়তো। ফলে ধান চাষ হয়না। এখন তো নদী ভাংগা এখন তো শাক ছাড়া হয়না কিছু।

কৃষক আব্দুস সাত্তার ব্যাপারী আরও বলেন, এই বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে তারা কয়েকজন কৃষক মিলে ধাপ পদ্ধতিতে পানির উপর ভাসমান সবজির বাগান গড়ে তুলতে সক্ষম হোন। প্রথম দিকে সবজির উৎপাদন কম হলেও এখন ভাসমান বাগানে সাফল্যের সাথে নানা ধরণের সবজি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। একই সাথে ভাসমান বাগানে তারা বিভিন্ন সবজির বিজতলা গড়ে তুলেছেন। ফলে তাদের আর সবজির চারা বাইরে থেকে কিনে আনতে হয় না বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আবু হেনা জাফর বলেন, এখানে কৃষকরা নিজেরা বীজ উৎপাদন করে। ফলে তাদের বাইরে থেকে বীজ কিনে আনতে হয় না। ফলে চাষাবাদে তাদের ব্যয় অনেক কমে যায়।

অন্য এক প্রবীন কৃষক আব্দুর রশিদ ব্যাপারীকে ধাপ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, বিল ডুমোরিয়ার জলাবন্ধ এলাকার পানিতে কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা ও বিভিন্ন জল সহিষ্ণু ঘাসসহ নানান জলজ উদ্ভিদে ভরপুর৷ তারা এ সব জলজ উদ্ভিদকে স্তূপ করে পচিয়ে তৈরি করেন ভাসমান এক ধরণের ধাপ৷ এই ভাসমান ধাপের উপরেই তারা সবজি চাষ শুরু করেন। তাদের চাষাবাদের নতুন এই পদ্ধতি সফল হওয়ায় এই এলাকার অনেক জলাবনদ্ধ জমিতে ধাপ পদ্ধতিতে পানির উপর ভাসমান সবজির বাগান গড়ে উঠতে থাকে। এখন নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী দোবড়া এবং কলার দোয়ানিয়া ইউনিয়নের বেশীরভাগ এলাকার জলাবদ্ধ জমিগুলোতে ভাসমান সবজি বাগান গড়ে উঠছে। এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ আবিস্কার হওয়ার পর কৃষকদের মুখে আবার হাসি ফিরেছে। ভাসমান বাগানের সবজি বিক্রি করে তারা এখন স্বচ্ছল জীবনযাপন করছেন।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আবু হেনা জাফর বলেন, তাদের এখানে প্রচুর কচুরিপানা আছে। কচুরিপানা, দূর্বীলতা তারপরে কোকো ডাস, শেওলা এগুলো এখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এগুলো দিয়ে তারা ভাসমান বেড তৈরি করে। তখন তারা এখানে সবজি চাষ করে।

এই এলাকার কয়েকজন প্রবীন কৃষকের সাথে আলাপ করে জানা যায়, ধাপ পদ্ধতি গড়ে তোলা ভাসমান সবজি বাগান গুলোর আকার লম্বায় ৭০/৮০ মিটার ও প্রস্থে দুই থেকে চার মিটার হয়ে থাকে। তবে বিজতলা তৈরীর জন্য ধাপগুলোর আকার একটু ছোট হয়। এগুলো লম্বায় ৫০/৬০ মিটার ও প্রস্থে দেড় থেকে দুই মিটার হয়ে থাকে। বীজতলা তৈরীর জন্য ধাপগুলো দুইস্তর বিশিষ্ট হয়ে থাকে। জলাভূমিতে প্রথমে কচুরিপানা, শ্যাওলা ও বিভিন্ন জলজ ঘাস স্তরে স্তরে সাজিয়ে দুই ফুট পুরু ধাপ বা ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয় বলে জানিয়েছেন প্রবীন কৃষকরা।

পানির উপর ভাসমান বাগানগুলোতে কৃষকরা সাধারণত লাউ, সিম, বেগুন, বরবটি, করলা, পেঁপে, টমেটো, শশা, মরমা, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, মরিচ ইত্যাদি শাকসবজি ও মশলার চারা উৎপাদন করে থাকেন কৃষকরা৷ অনেক কৃষক আবার লাল শাক, ঢেঁড়স, হলুদ চাষও করে থাকেন৷

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আবু হেনা জাফর জানান, নাজিরপুরে যারা আছে চাষী তারা সেখানে সবজি, লতা জাতীয় সবজি, লতা জাতীয় সবজি ছাড়া অন্য ঢ়েড়শ করে। লতার মাঝে শশা, তারপরে করলা, বরবটি এগুলো করে। তারপরে কুমড়া করে, এরপরে তারা মুসলা ফসল করে। মসলা ফসল এর মধ্যে হলুদ টায় তাদের প্রধান।

ধাপ পদ্ধতিতে ভাসমান বাগানগুলোতে কৃষকরা আগে জৈব সার ব্যবহার করতো। তবে এখন কৃষকরা ভাইরাসের কবল থেকে ফসলকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরণের রসায়নিক সার ও কিটনাষক ব্যবহার করে থাকেন।

কৃষক আব্দুস সাত্তার ব্যাপারী আরও বলেন, আগে তো খুব ভাল ফসল হয়েছে। এই কয়েক বছর ধইরা, আরকি রোগে আক্রান্ত কইরা আমরা জয়লাভ হতে পারি নি। যা লাগায় লস বুঝেছেন। ভাইরাস একটা রোগ আইছে এই আট আট দশ বছর ধইরা। হ্যাঁ যা লাগায় হেই তে রোগ ধরে।

নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী দোবড়া এবং কলার দোয়ানিয়া ইউনিয়নের প্রায় ২০০ হেক্টর জলাবন্ধ জমিতে বর্তমানে সাত কৃষক ভাসমান বাগানে চাষাবাদ করে থাকেন। এই চাষাবাদে শুধমাত্র পুরুষ কৃষকরা নয়, নারী কৃষকগণও কাজ করে যাচ্ছে সমান তালে।

বিল ডুমোরিয়ার নারী কৃষক শেফালী খাতুন বলেন, ভাসমান বাগানে এই গ্রামের অনেক নারী চাষাবাদের কাজ করেন। তিনি বলেন, “নারী কৃষকরা ভাসমান বাগান ও কান্দি কুফাইয়া হের পরে চাষ করে আলু লাগাইছি। লাগাইয়া হের পরে টোগা দিয়া রাগছি। শীতের সিজনে মরমা লাগায়। হেরপরে করলা লাগায়। হেরপর লাউ, চালকুমড়া আরো অনেক সব বেগুন, মরিচ, আলু লাগাই”।

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের জলাভূমতিতে কৃষি জমির বিকল্প হিসেবে জলাশয়ে ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতি কৃষিক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিল্পব সৃস্টি করেনি। আন্তজার্তিক অঙ্গনেও বেশ সাড়া ফেলেছে।

এরফলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) নাজিরপুরে উদ্ভাবিত ভাসমান পদ্ধতির এ চাষাবাদ এলাকাকে ‘বিশ্বের কৃষি ঐতিহ্য অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ২০১৭ সালে৷ আর এই স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেয়েছেন বিশেষ এ্যাওর্য়াড।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আবু হেনা জাফর জানান, “বাংলাদেশের নাজিরপুর পিরোজপুর জেলা ভাসমান কৃষি এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের একটি অংশ এবং এই বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে, ভাসমান সবজি চাষের জন্য।”

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকুলীয় অঞ্চলের যেসব এলকার নিচু জমি পানির নীচে তলিয়ে গেছে সেসব জমিতে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ প্রচলনের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

এ বিষয়ে নাজিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিক বিজয় হাজরা জানান, “দেশের যেসমস্ত এলাকায় জলাবদ্ধতা আছে, সেখানে এই কচুরিপানা ব্যবহার করর এই পদ্ধতি তে সবজি এবং মসলা চাষাবাদ করা যেতে পারে। সরকারের এই একটি প্রকল্প আছে ভাসমান বেডের সবজি ও মসলা চাষ সম্পর্কে গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রকল্প।

এটি বাংলাদেশের ৪২টি উপজেলায় এই কার্যক্রম টা চলমান। যেসমস্ত এলাকায় জলাবদ্ধতা আছে, মানে এই নাজিরপুরের মতই ঐখানেও এই কার্যক্রম চলে থাকে এবং এটা দেখে আরো সারাদেশে ছড়ায় যাবে।”

পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আবু হেনা জাফর এ বিষয়ে বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাথে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউট তারা গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছে। কিভাবে তাদের এই যে, তাদের যে সমস্ত মেটারিয়াল দিয়ে তারা বেড তৈরি করে। ভাসমান বেড এই বেডটি তারা এক সিজনের বেশি তারা ব্যবহার করতে পারে না।

এই বেডটি যেন তারা একাধিক বার ব্যবহার করা যায় এই ব্যাপারে তারা গবেষণা কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিভিন্ন মেটেরিয়াল ব্যবহার করে এই রিসার্চ করতেছে। যে কি জিনিস ব্যবহার করলে এই জিনিস তারা ৫ বছর ৭ বছর অথবা পনের বিশ বছর ব্যবহার করতে পারবে। এই ভাসমান টি আরো স্থায়িত্ব লাভ করবে, খরচ কমবে এবং লাভ হবে।

জলবায়ু পরিবতনের বিরূপ প্রভাবের ফলে দেশের উপকুলীয় অঞ্চলের যেসব নিম্ন এলাকা জলাববদ্ধ হয়ে পড়েছে সেসব এলাকায় এই চাষাবাদ পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে সরকারের কৃষি বিভাগকে আরও বেশী কাযকর উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া এই পদ্ধতির চাষাবাদে যেসব সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা রয়েছে তা নিবিড়ভাবে গবেষণার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে কৃষি গবেষকদের।

তবেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বঙ্গোসগারের পানীর লেভেল বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের উপকুলীয় অঞ্চলের যেসব নিচু এলাকা জলাবন্ধ হয়ে পড়ছে সেইসব এলাকায় ভাসমান বাগান তৈরী করে ব্যাপকভাবে নানা ধরণের সবজি উৎপাদ করা সম্ভব হবে। আর এইভাবে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবকে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here