বিশেষ প্রতিবেদনঃ সুন্দরবন এক রহস্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ খ্যাত এই ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট আমাদের গর্বের প্রতীক। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রাহরিণসহ এই সুন্দরবন সম্পদ প্রাচুর্য এবং জীব বৈচিত্র আমাদের’কে বিশ্বের দরবারে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশী-বিদেশী অনেক পর্যটক ও দর্শনার্থীরা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আগমন করে থাকেন। অপার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ এ বনাঞ্চল আমাদের’কে প্রাকৃতিক দূর্যোগ হতেও রক্ষা করে থাকে।

সুন্দরবনে আশির দশকে চাঁদাবাজি, অপহরণের মাধ্যমে শুরু হয় “জলদস্যু” নামে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে সুন্দরবনের জলদস্যু দমনে অগ্রণী ভূমিকা নেয় র‌্যাব। প্রতিষ্ঠা হতে অদ্যবধি পর্যন্ত র‌্যাব ২৪৬টি সফল অভিযান পরিচালনা করে ৫৮৬ জন জলদস্যু/বনদস্যু গ্রেফতার পূর্বক ১,৭৮০টি অস্ত্র ও ৪১,৯৫৫ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাবের অভিযানে বিভিন্ন সময়ে গুলিবিনিময়ের ঘটনায় ১৬৩ জন জলদস্যু/বনদস্যু নিহত হয়েছে। এছাড়া র‌্যাব এ যাবৎ পর্যন্ত সর্বমোট ০৯টি জীবিত রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা শাবক, ২৩টি রয়েল বেঙ্গল টাইগাইরের চামড়া, ২৯টি জীবিত হরিণ, ১২৯টি হরিণের চামড়া এবং বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল সংখ্যক পশু পাখি উদ্ধার করেছে।

২০১৫ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং সচেতনতা সৃষ্টির কাজে বিশেষ অবদান রাখায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক র‌্যাব ফোর্সেসকে ইধহমধনধহফযঁ অধিৎফ ঋড়ৎ ডরষফষরভব ঈড়হংবৎাধঃরড়হ-২০১৫ প্রদান করা হয়।

উপকূলীয় জেলা সমূহে মৎস্যজীবী জেলেদের মৎস্য আহরণ নির্বিঘœ ও জলদস্যুদের দমনের লক্ষ্যে ২০১২ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে র‌্যাব, পুলিশ কোস্টগার্ড, বিজিবি ও বন বিভাগের সমন্বয় করে এবং র‌্যাব মহাপরিচালককে প্রধান সমন্বয়কারী করে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্স গঠনের ফলে বেগবান হয় সুন্দরবনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান।

লিড এজেন্সি হিসেবে র‌্যাবের ক্রমাগত সাঁড়াশি অভিযানে জলদস্যু/বনদস্যু কোনঠাসা হয়ে পড়ে। দিশেহারা হয়ে জলদস্যুরা ফেরারী জীবনের অবসান ঘটিয়ে আত্মসমর্পণের পথ খুঁজতে থাকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্ববধানে র‌্যাবের নিকট সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ মে ২০১৬ হতে ০১ নভেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত সুন্দরবন অঞ্চলের সর্বমোট ৩২টি জলদস্যু বাহিনীর ৩২৮জন জলদস্যু, ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২,৫০৪ রাউন্ড গোলাবারুদসহ র‌্যাব এর নিকট আত্মসমর্পণ করে।

সুন্দরবন জলদস্যু মুক্ত হওয়ার প্রেক্ষিতে গত ০১ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে গণপ্রজান্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনকে জলদস্যু মুক্ত ঘোষণা করেন। এখন শান্তির সু-বাতাস বইছে সুন্দরবনে। অপহরণ-হত্যা এখন তিরোহিত। জেলেদের কষ্টার্জিত উর্পাজনের ভাগও কাউকে দিতে হচ্ছে না। মাওয়ালী, বাওয়ালী, বনজীবী, বন্যপ্রাণী এখন সবাই নিরাপদ। নির্ভয়ে নির্বিঘেœ আসছে দর্শনার্থী-পর্যবেক্ষক, জাহাজ বণিকেরা। এভাবেই সরকারের দূরদর্শিতায় সুন্দরবন কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার ব্যাপক সম্ভবনার দ্বারা উন্মোচিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব , দিক নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান এবং র‌্যাবের সক্রিয় অংশগ্রহণে জলদস্যু মুক্ত হয় সুন্দরবন। জলদস্যু মুক্ত সুন্দরবন অর্জন ছিল একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। মূলত র‌্যাবের রোবাস্ট অপারেশন ও আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় সন্নিবেশন ছিল আভিযানিক কৌশলের মূল চাবিকাঠি।

আত্মসমর্পণকৃত জলদস্যুরা অতিদ্রুত সামজের মূল শ্রোতধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। র‌্যাবের পক্ষ হতে ২০,০০০/- টাকা, শীতবস্ত্র, ০১টি করে মোবাইল সেট ও নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার সামগ্রী করা হচ্ছে এবং ঊীরস ব্যাংকের পক্ষ হতে ৫০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া র‌্যাব কর্তৃক জলদস্যুদের পূর্ববর্তী দক্ষতা অনুযায়ী এবং ক্ষেত্র বিশেষ নতুন করে সরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে নতুন নতুন কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে সহায়তা করা হচ্ছে।

বর্তমানে আত্মসমর্পণকারী সাবেক জলদস্যুরা পুনর্বাসিত হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। সরকারের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পনকারী সকল জলদস্যু/বনদস্যুদের বিরুদ্ধে রুজুকৃত চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অপরাধের (হত্যা ও ধর্ষণ) মামলা ব্যতিত অন্যান্য সকল সাধারন মামলা সহানুভূতি সহকারে বিবেচনার বিষয়টি চলমান রয়েছে।

ইতোমধ্যে সুন্দরবন অঞ্চলের জলদস্যু আতœসমর্পণ ও পুনর্বাসনে প্রক্রিয়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে গত ২০ অক্টোবর কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার ০৬টি জলদস্যু বাহিনীর ৪৩জন জলদস্যু, ৯৪টি অস্ত্র ও ৭,৬৩৭ রাউন্ড গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছে।

পরিশেষে সুন্দরবনকে জলদস্যু মুক্তকরণে র‌্যাবকে সহায়তা করায় স্থানীয় জনসাধারণ, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাসহ সকলের প্রতি র‌্যাবের পক্ষ হতে অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here