দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে যমুনা নদীর ওপর তৈরি হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু’। এ প্রকল্পটিসহ মোট ৯টি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

এজন্য ব্যয় হবে ১৪ হাজার ১১ কোটি ৮০ লাখ ৪১ হাজার ৮৫০ টাকা। শুধু ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু’ নির্মাণেই ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৯৫০ কোটি ৬ লাখ ৮৩ হাজার ৩৬৭ টাকা।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে অনুমোদিত প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

 

 

যমুনা নদীর ওপর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ’ হচ্ছে। এটি বর্তমান সরকারের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আর একটি নতুন মাইলফলক হবে। দুটি প্যাকেজে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ১২ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা ৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। প্রকল্পে জাইকা আর্থিক সহায়তা দেবে। প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

যমুনা নদীর ওপর বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সেতু যা, দেশের পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে। সেতুটি আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। ভারত, মিয়ানমার এবং ভূমিবেষ্টিত প্রতিবেশী ভুটান ও নেপালসহ উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ।

 

 

এছাড়া সেতুটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ লিংক। বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুতে চার লেনের মহাসড়কসহ সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে ট্রাফিকের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যমান সেতুটির ধারণক্ষমতা আরো বাড়ানো দরকার। এ কারণে সরকার কর্তৃক বর্ধিত জাতীয় ও আঞ্চলিক ট্রাফিক চাহিদা পূরণে বিদ্যমান সেতুটির সমান্তরালে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন বিশিষ্ট একটি ডেডিকেটেড রেলসেতু নির্মাণের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ‘একনেক’ কর্তৃক অনুমোদিত হয়।

 

 

 

জাপানভিত্তিক দুই প্রতিষ্ঠান ডব্লিউডি-১ ওটিজে জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং ডব্লিউডি-২ প্যাকেজে আইএইচআই এসএমসিসি জয়েন্ট ভেঞ্চার সর্ব নিম্নদাতা হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি একটি শর্ত দিয়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রকল্পে আগে ব্যয় ধরা হয়েছিল। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৯ হাজর ৭৩৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। যেহেতু ব্যয় বেড়েছে সেহেতু প্রকল্পটি আবার একনেকে অনুমোদন নিতে হবে। একনেক থেকে অনুমোদন হওয়ার পর প্রস্তাবটি আর ক্রয় কমিটির বৈঠকে আনার প্রয়োজন হবে না।

 

 

অর্থমন্ত্রী বলেন, ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে অনুমোদিত ‘বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র’ প্রকল্পের আওতায় পটুয়াখালী জেলায় ৩৬টি সাইক্লোন শেল্টার ও তৎসংলগ্ন সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজের প্যাকেজ নং-এনডব্লিউ-৫ এর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ২৪ কোটি ৩২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯৪ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে দ‌্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও নবারুন ট্রেডার্স লিমিটেড।

 

 

একই প্রকল্পের আওতায় (প্যাকেজ নং-এনডব্লিউ-০৭) পিরোজপুরে ৫০টি সাইক্লোন সেন্টার তৈরি করবে রাফিয়া কন্সট্রাকশন লিমিটেড ও মেসার্স এসবি ট্রেডার্স। এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৩১৯ কোটি ৫০ লাখ ১৩ হাজার ৯৫০ টাকা।

অন্য একটি প্যাকেজ চট্টগ্রাম জেলায় ২৫টি সাইক্লোন সেন্টার তৈরি করবে সরকার স্টিল লিমিটেড। এতে ব্যয় হবে ১০৩ কোটি ৭৫ লাখ ১ হাজার ১৭৮ টাকা।

 

 

আইডিএর অর্থায়নে প্যাকেজ নং-এনডব্লিউ-৩-বি এর অধীনে চট্টগ্রাম জেলায় আরো ২৫টি সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের কাজ পেয়েছে সরকার স্টিল লিমিটেড। ব্যয় হবে ১০৭ কোটি ৫ লাখ ১৪ হাজার ২৬০ টাকা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট (২য় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ২৫টি পার্টনারশিপ এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকল্পে উক্ত প্রকল্পের পূর্ববর্তী প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত এনজিও/সংস্থার ৭ মাস মেয়াদে (জানুয়ারি-জুলাই, ২০১৯) পার্টনারশিপ চুক্তি বর্ধিতকরণ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পোপালগঞ্জ পৌরসভার সঙ্গে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৩২ টাকায় পার্টনারশিপ চুক্তি বর্ধিত করতে কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে তা অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

 

 

‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ‘পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলাধীন জগন্নাথকাঠি চান্দকাঠি জিসি সড়কে (রোড আইডি: ৫৭৯৮৭২০০১০১) ১৫৩৫০ মিটার চেইনেজে কালিগঙ্গা নদীর ওপর ৬০০ মিটার ব্রিজ নির্মাণ’ কাজের ভেরিয়েশন প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এনবিআর কর্তৃক ভ্যাট বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পে ভেরিয়েশন বাবদ ৪ কোটি ১১ লাখ ৭১ হাজার ৩৪৫ টাকা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১১৯ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮৬ টাকা।

 

 

বৈঠকে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ‘শতভাগ পল্লী বিদ্যুতায়নের জন্য বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ (রাজশাহী, রংপুর খুলনা ও বরিশাল বিভাগ)’ শীর্ষক প্রকল্পের একটি প্যাকেজের আওতায় কন্ডাক্টর, এসিএসআর ও বেয়ার ক্রয়ের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দরপত্রে ৬টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবিএস কেবলস লিমিটেড কাছ থেকে ২৩ হাজার ২০ কিলোমিটার কন্ডাক্টর, এসিএসআর ও বেয়ার সংগ্রহ করবে। এজন্য ব্যয় হবে ৯৪ কোটি ৭০ লাখ ৯৫ হাজার ৭৪০ টাকা।

 

 

বৈঠকে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘প্রকিউরমেন্ট অব ৩৫ কমার্শিয়াল অ্যান্ড অক্সিলারি ভেসেল অ্যান্ড কন্সট্রাকশন অব ২ নিউ স্লিপওয়ে ফর বিআইডব্লিউটিসি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৬টি কে টাইপ (মিডিয়াম টাইপ) ফেরি নির্মাণ ও সরবরাহ কাজের দরপত্র অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলি বিল্ডার্স লিমিটেড ফেরিগুলো নির্মাণ ও সরবরাহ করবে। এতে ব্যয় হবে ১৩৯ কোটি ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩৪ টাকা ব্যয় হবে।

 

 

এর আগে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ভূমি উন্নয়নসহ ভৌত ও অন্যান্য কাজসমূহ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সম্পাদনের লক্ষ্যে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের পৌরসভা উন্নয়ন সহায়তা থোক বরাদ্দ খাতের আওতায় ‘যান-যন্ত্রপাতি ক্রয়’ উপ-খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে পৌরসভার জন্য রোড রোলার (৯-১২ টন) ক্রয়ের লক্ষ্যে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here