মানবসেবার ব্রত নিয়ে তাঁরা বেছে নিয়েছেন নার্সিং পেশাকে। বর্তমান সময়ে ঠিক যেন স্রোতের বিপরীতে তাদের অবস্থান। নার্সিং পেশাটি যে মহান তা তাঁরা প্রমাণ করতে চান ধর্ম-বর্ন-নির্বিশেষে সকল মানুষকে সেবা করে। রোগীদের কাছ থেকে কোনো উৎকোচ তো নেনই না উপরন্তু অনেক সময় চাঁদা তুলে তাদের লাশ গ্রামের বাড়ীতে পৌঁছে দেন।

এছাড়া বর্তমান সময়ে প্যাথলজি বা কিনিকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নার্সদের যে অফার দেয় সেটাও তাঁরা গ্রহণ করেন না। সরকার নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদায় উন্নীত করার কারণে দেশের বিরাটসংখ্যক শিক্ষার্থী সম্প্রতি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি পেশা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। দেশে বর্তমানে রেজিস্টার্ড নার্স- মিডওয়াইফারি রয়েছে ৫৬ হাজার ৭৩৩ জন। সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অধীনে নার্স প্রায় ৩০ হাজারজন। মিডওয়াইফারি প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন। বাংলাদেশে ৪৩টি সরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি ইনস্টিটিউট রয়েছে । যার মধ্যে বেসরকারি রয়েছে ১২০টি।

সরকারি নার্সিং কলেজ ১৭টি ও বেসরকারি কলজে ৬০টি। এতগুলো নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজ থাকার পরও নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী শিার্থীদের প্রবল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ভর্তি হতে হয়। পাশাপাশি নার্সিং পাশ করে চাকুরীস্থলে রোগীর মৃত্যু কেন্দ্র করে অনেক সময় নার্সদের লাঞ্চিতও করা হয়। তবে মানবসেবার ব্রত নিয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছরে বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়(শেবাচিম) হাসপাতালে এক ঝাঁক পরী গুরুত্বপূর্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশাল নগরীর বাসিন্দা অঞ্জলী রাণী সরকার।

১৯৭০ সালের দিকে নার্সিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেবিকা হিসেবে যোগদান করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তখন থেকেই নিবেদিত প্রাণ একজন সেবিকা হিসেবে সুনাম গড়ে ওঠে তার। চাকুরীর ৫ বছর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে বদলী হয়ে আসেন বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে। এর পরেই ১৯৮৫ সালে তিনি অভিজ্ঞতার আলোকে শেবাচিম হাসপাতালে সেবা তত্ত্বাবধায়কের চলতি দায়িত্ব পালন করেন।

অঞ্জলী রাণী সরকারের বয়স প্রায় ৬৫ বছর। তিনি ভাল আছেন। কিন্তু বয়সের ভারে অনেকটাই বেশি নুয়ে গেছেন। তিনি শ্রবন শক্তিও কিছুটা হারিয়ে ফেলেছেন। অঞ্জলী রাণী সরকার আজকের বার্তাকে জানান,“দীর্ঘ জীবনে আমি রোগীদের সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। ভালই লেগেছে নার্সিং পেশায়। আমি নিজেই উৎসাহিত হয়ে নার্সিং পেশায় এসেছিলাম।”

ক্রমান্বয়ে এই হাসপাতালে রোগীদের সেবায় ১৯৯৭ সালে রোজল্যান্ড বিভা বাড়ৈ, ২০০৩ সালে তেরেজা গোমেজ, ২০০৪ সালে কুসুম গোপ, ২০০৫ সালে মঞ্জুয়ারা বেগম ও একই বছরে আলেয়া পারভীন, ২০০৭ সালে সাহালিয়া খানম, ২০১৪ সালে মিরা সরকার ও একই বছরে হোসনে আরা খানম, ২০১৬ সালে আলেয়া বেগম ও একই বছরে মমতাজ বেগম, ২০১৭ সালে গায়ত্রী সমদ্দার, ২০১৮ সালে সেলিনা আক্তার(ভারপ্রাপ্ত) ও একই বছরে মোসাম্মত রাশিদা বেগম, ২০১৯ সালে উপ সেবা তত্ত্বাবধায়ক পদে দায়িত্ব পালন করেন আরতী রানী সমাদ্দার।

শেবাচিম হাসপাতালে বর্তমানে সেবা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সেলিনা আক্তার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় ও রোগী-স্বজনদের প্রার্থনায় এক ঝাঁক পরী দুনিয়াতে এখনও বেঁচে আছেন। তাঁরা সবাই পরিবারের সদস্যেদের সঙ্গে থেকেই সময় পার করছেন। হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত সেবা তত্ত্বাবধায়ক পদে ছিলেন রাশিদা বেগম। কথা হয় তার সঙ্গে।

রাশিদা বেগম বলেন,‘নার্সেরা সমাজের সবচেয়ে টাচি বিষয়ে সেবা দিয়ে থাকেন। তারা মানবসেবার অনন্য উদাহরণ। এ পেশার মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে কোন রোগী বা ব্যক্তির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে সেবিকা বা নার্স। রাশিদা বেগম বলেন নার্সিং পেশায় আসার লক্ষ্যে মা-বাবা কখনও হ্যা/না কিছুই বলেননি। তবে আমারবোনজামাই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছেন।

আগে রোগীরা যখন খারাপ আচরণ করতো তখন আমরা তাদের অসুস্থ্য শরীরের কথা চিন্তে করে সবকিছু সহ্য করতাম।কিন্তু আগের তুলনায় এখন কতিপয় রোগী ও স্বজনরা নার্সদের সঙ্গে খুবই খারাপ ব্যবহার করে।” ইউরোপের দেশ স্পেন জন্মেছিলেন কারমেন কিলমার্টিন। রোগীর সেবা করতে গিয়ে কারমেন কিলমার্টিন বলেছিলেন,“সেই সময় আমার নিজেকে সামান্য একটা ‘ক্ষত বাঁধার গজ’ বলে মনে হয়।

এই কথা শুনে কারমেন কিলমার্টিনের বান্ধবী তাকে বলেছিল: ‘এক মূল্যবান “ক্ষত বাঁধার গজ” কারণ একজন লোকের যখন অসুখ হয় তখন অন্য যে কোন কিছুর চেয়ে তোমার মতো একজন সহানুভূতিশীল নার্সকে তার সবচেয়ে বেশি দরকার।’”“ডাক্তার রোগ সারান কিন্তু নার্স রোগীর দেখাশোনা করেন। এই জন্য নার্সদের প্রায়ই মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়া সেই সমস্ত রোগীদের গড়ে তুলতে হয়, যারা জানতে পারে যে তাদের এক দীর্ঘস্থায়ী রোগ হয়েছে বা খুব শীঘ্রই মারা যাবে। আপনাকে একজন রোগীর মায়ের ভূমিকা নিতে হবে।”

হাসপাতালটিতে একজনই উপ-সেবা তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি হলেন আরতী রাণী সমাদ্দার।

সাক্ষাতে কথা হলে আরতী রাণী সমাদ্দার বলেন,“নার্সিং পেশায় আসতে আমার পরিবারের সকলে সহায়তা করেছেন। প্রতিদিন আমার ভাই আমাকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে গেছেন।তাছাড়া রোগীদের সেবা করতে ভালই লেগেছে। রোগীদের বিছানা ঠিক করে দেওয়াসহ সকল কাজ করতাম আমরা। আরতী রাণী সমাদ্দার আরও বলেন পূর্বে নার্সের সংখ্যা কম থাকায় রোগীদের নিয়ে ঝামেলা কম হতো।

কিন্তু বর্তমানে নার্সও বেশি ঝামেলাও বেশি পোহাতে হয়।” শেবাচিম হাসপাতালের বর্তমান সেবা তত্ত্বাবধায়ক সেলিনা আক্তার বলেন,“মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়েছি। একটু ভালো কাজ করতে না পারলে এ জন্মের সার্থকতা কিসে। তাই ধর্ম-বর্ন-নির্বিশেষে সকল মানুষকে সেবা দিয়ে আমি এক ধরনের শান্তি অনুভব করি। জীবনে ভালো কাজ করলে ফলটাও ভালো পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, আমার এখানে এমন রোগীও আসে যারা কখনও ভাবতেও পারেনা যে একজন সেবিকার কাছে গিয়ে এতোটা সেবা পাবে। আমি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তার সেবা করছি। তাছাড়া সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের পাশে দাঁড়াতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। সারাজীবন আমি সকল মানুষের সেবা করে যেতে চাই। সেবা তত্ত্বাবধায়ক সেলিনা আক্তার বলেন কলেজে যখন অধ্যায়নরত ছিলাম তখন থাকা-খাওয়ার খুবই কষ্ট ছিল। যেকারনে কাপড়-চোপড় নিয়ে কলেজ থেকে পালিয়াছিলাম। কিন্তু কলেজের গেইট দাড়োয়ান আমাকে ধরে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে নিয়ে যায়। তখন প্রিন্সিপাল স্যারের পরামর্শক্রমে ফের অধ্যায়নে মনোযোগী হই।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here