অনলাইন ডেস্ক// ভোলা তথা দক্ষিণাঞ্চলের হরিণের মাংস পাচারকারী চক্রের মূল হোতা হোটেল আলাউদ্দিনের মালিক আলাউদ্দিনকে বাদ দিয়ে মামলার চার্জশিট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভোলা জেলঅ ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে। হরিণের মাংস পাচারকারী চক্রের মূল হোতা হওয়ার পরও কিছু দিন আত্মগোপনে থাকার পর এখন ভোলায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পাচারকারী আলাউদ্দিন। তাকে বাদ দেওয়ার ফলে এ মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন নিরীহ হোটেল কর্মচারী জন্টু দাস ও টেম্পোচালক আমিনুল ইসলাম। সাধারণ মানুষের অভিযোগ- এ পাচারকারীর টাকায় ও হরিণের মাংসের কাছে প্রশাসনের সবাই বিক্রি হয়ে যায়। যার টাকা দরকার তাকে টাকা দিয়ে ও যার হরিণের মাংস খাওয়ার সখ তাকে মাংস দিয়ে ম্যানেজ করা হয়। এসব করে আলাউদ্দিন এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক। ভোলা প্রশাসনের টপ টু বটম সবাই তার হাতের কবজায়।

তবে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা আলাউদ্দিকে বাদ দেওয়ার পেছনে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ টাকার ৪ লাখ টাকা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকতা, বাকি ২ লাখ টাকা তদন্ত কর্মকর্তার পকেটে গেছে বলে জানা যায়। ইয়াবার চেয়েও হরিণের মাংস পাচার সহজ ব্যবসা হওয়ায় বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন ও মনপুরা উপজেলার কিছু ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বার ও রাজনৈতিক নেতাসহ একটি চক্রের মাধ্যমে আলাউদ্দিনের এ উত্থান। তার রাজত্বের কথা এখন টক অব দা টাউন। তবে মূল হোতা আলাউদ্দিনকে বাদ দিয়ে সোনালী ব্যাংকের মিথ্যে মামলায় জেল খাটা জাহে আলমের মতো ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছে প্রশাসন! এদিকে মামলার পুনরায় তদন্ত দাবি করে আবারো আদালতের দ্বারস্থ হবেন জন্টু ও আমিরুল ইসলাম। যাতে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা আলাউদ্দিনকে অভিযুক্ত করে আইনের আওতায় আনা হয়, জন্টু ও আমিরুলকে যেন ফাঁসানো না হয়।

উল্লেখ্য, ভোলার বোরহানউদ্দিনের টবগি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে গত বছরের ১৪ নভেম্বর ১১০ কেজি হরিণের মাংস ও ১টি চামড়াসহ জন্টু চন্দ্র দাস ও মাহেন্দ্র ড্রাইভার মো. আমিরুল ইসলাম নামে দুই যুবককে আটক করে থানা পুলিশ। তবে তাদের দেওয়া তথ্যমতে এ হরিণের মাংস পাচারের মূল হোতা ভোলা সদর রোডস্থ হোটেল আলাউদ্দিনের মালিক মো. আলাউদ্দিনকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

এ ঘটনায় বোরহানউদ্দিন থানার কর্তব্যরত পুলিশের এসআই (নিরস্ত্র) জ্ঞান কুমার বাদী হয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে একটি মামলা করেন। বোরহানউদ্দিন থানা মামলা নম্বর ১০। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ১৪ নভেম্বর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন কিছু লোক বোরহানউদ্দিন উপজেলার ২ নম্বর ওয়ার্ডের মীর বাড়ীর জামে মসজিদের পাশে ভোলা চরফ্যাশন মহাসড়কে হরিণের মাংস বিক্রি করছে। সেখানে অভিযান চালিয়ে হোটেল আলাউদ্দিনের কর্মচারী জন্টু দাস ও টেম্পো ড্রাইভার আমিরুলকে আটক করে পুলিশ। এ সময় আরো কয়েকজন পালিয়ে যায়।

রাতে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আলাউদ্দিন ও মো. সিদ্দিক তাদেরকে নিয়ে এসেছেন বলে জবানবন্দি প্রদান করে দুজন।

হোটেল আলাউদ্দিনের কর্মচারী জন্টু দাস বলেন, আমি আলাউদ্দিনের দোকানে কাজ করি। তিনি তাকে নিয়ে আলম চেয়ারম্যান এর ঘাটে আসেন। তাই আলাউদ্দিনকে ৩ নম্বর আসামি করে পুলিশ। অপরদিকে আমিরুল ইসলাম জানান, আমি মাহেন্দ্র চালাই। রাতে ভাড়ার কথা বলে মো. সিদ্দিক আমার টেম্পো ভাড়া করে। পরে সিদ্দিককে ৪ নম্বর আসামি করা হয়। সিদ্দিক আলাউদ্দিনকে আমিরুলের ফোন নম্বরটি দেওয়ার পরে আলাউদ্দিন ফোনে আমিরুলকে গাড়ি নিয়ে যেতে বলেন এমন কথা এজাহারে উল্লেখ করেন। কিন্তু ডিবির তদন্তে বলা হয়, জন্টু দাসকে হোটেল থেকে ঘটনার তিন মাস আগে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাই পুলিশের কাছে আলাউদ্দিনের নামে মিথ্যে তথ্য দিয়েছে এমন অভিযোগে ডিবি জন্টুকে আসামি রেখে আলাউদ্দিনকে বাদ দেয় চার্জশিট থেকে। কিন্তু জন্টু দাস এখনো হোটেল আলাউদ্দিনে কর্মরত আছে, বেতন সবই নিচ্ছে। বর্তমানে জন্টু ও আমিরুল আদালত থেকে জামিনে আছেন, তবে সিদ্দিক ঘটনার দিন থেকে পালাতক।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, আলাউদ্দিন কয়েক বছর যাবৎ ভোলার মনপুরার বিভিন্ন চর থেকে একাধিক চক্রের মাধ্যমে হরিণের মাংস পাচার করে আসছে প্রশাসনের সহযোগিতায়। এর জন্য ভোলার উপকূলীয় থানার যোগসাজসে এ কাজ করছেন। তবে এর আগেও অনেকবার হরিণের মাংস ও চামড়া পাচারের সময় আলাউদ্দিন ও তার সহযোগী আটক হলেও প্রশাসনের সাথে আপসরফা করে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলেন। সর্বশেষ দুই থানার দরকষাকষিতে ১১০ কেজি মাংসের মাসোহারা থানায় না দেওয়ায় পুলিশের অভিযানে মাংস আটক হয়।

তবে এ বিষয়ে বক্তব্য চাওয়া হলে বোরহানউদ্দিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অসিম কুমার ও মামলার বাদী জ্ঞান কুমার বক্তব্য প্রদানে অপরাগতা প্রকাশ করে বলেন, ঊর্ধ্বতনরা এ বিষয়ে মিডিয়া সেন্টার বক্তব্য প্রদান করবেন। এদিকে ভোলা ডিবির ওসি শহিদুল হকও বক্তব্য প্রদানে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

এদিকে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা আলাউদ্দিন ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য প্রদানে রাজি নন। তবে তিনি নিজেকে বিভিন্ন নেতার আত্মীয় বলে দাবি করেন।

এ বিষয়ে ভোলা পুলিশ সুপার মো. মোকতার হোসেন বলেন, এ ধরনের ছোটখাটো বিষয়ে আমি বক্তব্য দেই না। তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য প্রদান করেননি। তবে এ বিষয়ে কারো কোনো আপত্তি থাকলে আদালতে আরজি দেওয়া হলে আদালত আবারো তদন্ত দিতে পারে।

উপকূলীয় বন বিভাগ ভোলার বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞ্চা এ বিষয়ে জানান, ৩ হাজার ৪ শত বর্গকিলোমিটার ভোলায় এক হাজার কিলোমিটার জায়গাজুড়ে রয়েছে হরিণ, ভোঁদড়, মেছোবাঘসহ অসংখ্য প্রাণী। এসব বন্যপ্রাণী যেন কেউ হত্যা না করতে পারে সে জন্য আমাদের প্রতিটি রেঞ্জে একটি টহল টিম গঠন করেছি। কিছু দুস্কৃতককারী হরিণের মাংস পাচার করার চেষ্টা করে তাদের বিষয়ে আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। মনপুরা, দৌলতখান ও তজুমদ্দিন থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো পদক্ষেপের ঘাটতি নেই। তবে অনেক আসামি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে থানা ও আদালত থেকে বের হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

-কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here