অনলাইন ডেস্ক :: বরিশাল নগরীর কলেজ রো থেকে অপহৃত তিন বছরের শিশু দীপা রানী সমাদ্দার ওরফে পুটি সাড়ে তিন মাস পরও হদিস মেলেনি। এমনকি ছোট্ট শিশুটি কোথায় আছে, বেঁচে আছে না কী তাকে মেরে ফেলা হয়েছে এই বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত কিছু বলতে পারছে না। শুধু তদন্তের নামে পুলিশ সময় অতিবাহিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের এমন কালক্ষেপন নিয়ে শিশু দীপার পরিবারে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ক্রমশই বাড়ছে। পাশাপাশি শহরের সচেতন মহলেও বিষয়টি নিয়ে দিনে দিনে ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এমতাবস্থায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল মহানগর কমিটির সভাপতি প্রফেসর গাজী জাহিদ হোসেন বলেছেন- একটি শিশু দিনের বেলা নিখোঁজ হলো অথচ তিনমাসেও তার কোনো হদিস পাওয়া গেল না- এটা আসলেই চিন্তার বিষয়। শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশের আন্তরিকতা অভাব রয়েছে বলে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

গত ৬ জানুয়ারি রোববার সকাল ১০টায় শিশু দীপা বাসার সামনে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ হওয়ার পর অজ্ঞাত ব্যক্তিরা মুঠোফোনে দীপার বাবার কাছে একাধিকবার কল ও ম্যাসেজ দিয়ে ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এতে পরিবারের সন্দেহ হয় দীপাকে অপহরণ করা হয়েছে।

এই ঘটনায় দীপার বাবা রেস্তোরাঁ কর্মচারী বিনয় সমাদ্দার বাদী হয়ে ৭ জানুয়ারি রাতে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন।

মামলাটিকে আসামিরা অজ্ঞাত থাকলেও পুলিশ তাদের প্রতিবেশী রাসেল খান ও তার ভাই সজীব খান, ফারুক এবং আসাদুল হকসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে।

এই ৫জনই বরিশাল মহানগর বিচারিক হাকিম পলি আফরোজের আদালতে জবানবন্দি দেন। সেখানে তাঁরা দীপার বাবার কাছে মুঠোফোনে ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ চাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে দীপাকে অপহরণে কথা অস্বীকার করেন।

তাদের দাবি- দীপা নিখোঁজ হওয়ার পর লোভে পড়ে তাঁরা মুঠোফোনে অপহরণের কথা বলে ওই অর্থ চেয়েছিলেন। বর্তমানে আসাদুল বাদে বাকি চারজন এখন জেলহাজতে রয়েছেন। কিন্তু এরপর মামলার তদন্ত বলতে গেলে একরকম অগ্রগতি ছাড়াই স্থিমিত হয়ে আছে।

ঘটনার পরে তিন মাস অতিবাহিত হলেও তদন্তে স্থবিরতা ও মেয়ের খোঁজ না পাওয়ায় চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দিন কাটাচ্ছে দীপার পরিবার। তিন মাস পরেও মেয়ের খোঁজ না পেয়ে দীপার মা চায়না সমাদ্দার প্রায় শয্যাশায়ী।

মঙ্গলবার সকালে অপহৃত দীপার কলেজ রোডের বাসায় গিয়ে দেখা গেছে- মেয়ের ছবি নিয়ে কাঁদছেন মা চায়না সমাদ্দার। তিনি ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘তিন মাস হয়ে গেল মেয়েটা নিখোঁজ। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ বলতে পারে না আমার মেয়ে কোথায় আছে, কেমন আছে, কীভাবে আছে। কীভাবে বুঝবো যে আমার মেয়েকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তিনমাস ধরে রাত-দিন প্রহর গুনছি এই বুঝি আমার মেয়ে আমার বুকে ফিরে এলো। কই আসে না তো’?

তিনি অভিযোগ আকারে বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে অন্তত তিনদিন থানাতে যাই, পুলিশ শুধু বলে আমরা দেখতেছি। কই তাঁরা কিছুই তো দেখছেন না। দেখলে এতোদিনেও আমার মেয়েকে খুঁজে পেতাম না। আমরা গরীব, তাই মেয়েকে উদ্ধারের ব্যাপারে কেউ গুরুত্ব দেয় না। আমাদের বড় কেউ থাকলে এতোদিনে আমার দীপা উদ্ধার হতো।’

দীপার বাবা বিনয় সমাদ্দার অভিযোগ করেন- পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা টাকা চাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তারপরও কেন পুলিশ দীপাকে উদ্ধার করতে পারছে না এই বিষয়টি তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। বরং তারা গরীব বলে দীপাকে উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা নেই বলে মনে করেন তিনি।

বিনয় সমাদ্দার আরও বলেন- দীপা অপহরণ হওয়ার আগের দিন তাঁরা বেসরকারি সংস্থা ‘আশা’ থেকে ৩৬ হাজার টাকা ঋণ তুলেছিলেন। এটা প্রতিবেশী রাসেল খান জানতো। আর ওই টাকার লোভেই দীপাকে তারা অপহরণ করেছেন।

কান্নাজড়িত কন্ঠে বিনয় সমাদ্দার বলেন, পুলিশ এর চেয়েও অনেক জটিল ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে। কিন্তু দীপার কোনো সন্ধান পাচ্ছে না কেন প্রশ্ন রাখেন তিনি।

এই অপহরণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি মডেল থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) সাইদুল হক বলেন, দীপা অপহরণের পর প্রতিবেশী রাসেল খান ও তার ভাই সজীব খান এবং ফারুক ও আসাদুল হকসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ৫ জনই বরিশাল মহানগর বিচারকি হাকিম আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। কিন্তু তারা শিশুটির বাবার কাছে টাকা দাবি করার কথা স্বীকার করলেও শিশুটিকে অপহরণের কথা অস্বীকার করেছে।

সেই সাথে তদন্তে গাফেলতির বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন- এই মামলাটি আমরা চাঞ্চল্যকর হিসেবে গ্রহণ করেছি। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখন তদন্ত কাজ তদারকি করছেন। এতে কারও গাফলতি নেই। বরং নতুন বেশকিছু সূত্র ধরে তদন্ত চলছে। এক কথায় বলা চলে শিশুটিকে উদ্ধারে আমরা এখনও সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বলে জানান এসআই সাইদুল।

এক্ষেত্রে বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল ইসলামের ভাষ্য হচ্ছে- শিশু দীপার সন্ধান পেতে পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করছে। কিন্তু আসামিরা মুক্তিপণ চাওয়ার কথা স্বীকার করলেও অপহরণের বিষয়ে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। যে কারণে কোন ক্লু ছাড়াই অপহৃত শিশুটিকে খুঁজে বের করতে সময় লাগছে বলে দাবি করেন ওসি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here